এত সহজেই ভালোবেসে ফেলি কেন!

‘বুঝি না আমার রক্তে কি আছে নেশা-/ দেবদারু-চুলে উদাসী বাতাস মেখে…’ রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর কবিতার মতোই মানুষ সহজেই ভালোবেসে ফেলে। রক্তে আদিম কোনো টানে ভালোবাসা বারবার মানুষের মধ্যে ফিরে আসে। নানা রূপে, নানা আঙ্গিকে ভালোবাসা আসে রঙিন ঘুড়ি উড়িয়ে। ভালোবাসা মানুষে মানুষে বন্ধন তৈরি করে, সম্পর্কের গভীরতাকে করে আরও গভীর।

প্রতিবছর আগে চলে এলেও এবার কিন্তু ভালোবাসা দিবসের দিনে গলাগলি করেই আসছে ফাল্গুন। পহেলা ফাল্গুন বসন্তের প্রথম দিন তাই হবে বসন্তবরণ উৎসব, অন্যদিকে ইংরেজি ক্যালেন্ডারে ১৪ ফেব্রুয়ারি— এদিন একইসঙ্গে পালিত হবে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’।

বসন্ত এলেই শীতে রুক্ষতায় শুষ্ক বৃক্ষ, মাটি প্রাণ ফিরে পেতে থাকে। গাছে গাছে ফুটে নানা রঙের ফুল। তাই এ বছর ফুলে ফুলে আর ভালোবাসায় মিশে একাকার হবে দিনটি।

শহরজুড়ে ভালোবাসা আর বসন্ত বন্দনার আবেশ

আগুন লাগা ফাগুনের দিন তরুণরা পাঞ্জাবি এবং তরুণীরা বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে ঘুরে বেড়ায়। তরুণীরা খোঁপায় ফুল গুঁজে ঘুরতে বের হয়। শাহবাগ, কাঁটাবনসহ রাজধানীর ফুলের দোকানগুলোতে গাঁদা, রজনীগন্ধা, বেলী ও গোলাপের চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, টিএসসি, চারুকলাসহ পুরো শাহবাগ এলাকাতেই অসংখ্য নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ, তরুণ-তরুণীরা বসন্ত উৎসবে মেতে ওঠে।

ভালোবাসা স্থান, কাল ও পাত্রভেদে বিভিন্ন রূপে এসেছে, থেকেছে। কখনো পেয়েছে স্বীকৃতি আবার কখনো বা পায়নি। তবে ভালোবাসার জন্য একটি বিশেষ দিন পালিত হবে, শতকের গোঁড়ার দিকেও এ অঞ্চলের মানুষ তা ভাবতে পারেনি। কিন্তু দিন দিন বাংলাদেশ ও আশেপাশের অঞ্চলে ভালোবাসা দিবস জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, পালিত হচ্ছে অনেকটা বড়সড় আয়োজনে।

লাল গোলাপে ভালোবাসার আবেদন

ভালোবাসা দিবস কেবল তরুণ-তরুণীদের ভালোবাসা প্রকাশ নয়, নানা বয়সের মানুষের ভালোবাসার বহুমাত্রিক রূপ প্রকাশের দিন। এ ভালোবাসা যেমন মা-বাবার প্রতি সন্তানের, তেমনি মানুষে-মানুষে ভালোবাসাবাসির দিনও এটি।

ইতিহাসের ভাঁজ খুললে দেখা যায়, ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ নামকরণে রয়েছে রোমানদের ভূমিকা। ২৭০ সালের দিকে রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস তরুণদের বিয়েতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। নিষেধাজ্ঞা না মেনে ভালোবাসার বাণী প্রচার শুরু করেন ভ্যালেন্টাইন। নিষেধাজ্ঞা না মেনে ভালোবাসার বাণী প্রচার করায় শাস্তিস্বরূপ ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি, পোপ গেলাসিয়াস ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখকে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ ঘোষণা করেন। বিশ্বব্যাপী খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

শহরজুড়ে প্রেমিক-প্রেমিকাদের মিলন মেলা

ভালোবাসা দিবসের উদযাপন কবে থেকে শুরু হয়, সে বিতর্ক শিকেয় তুলে আধুনিক যুগের দিকে নজর দেওয়া যাক। প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী পরিবর্তিত হচ্ছে। পাল্টাচ্ছে রীতি-নীতি, আচার। আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে বদলাচ্ছে যোগাযোগের ধরন।

রাজপথ, উদ্যান, অমর একুশে একুশের গ্রন্থমেলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুশোভিত সবুজ চত্বরসহ পুরো রাজধানী উৎসবে মুখর হবে। গ্রন্থমেলা পরিণত হবে প্রেমিক-প্রেমিকাদের মিলন মেলায়। একে অন্যের হাতে তুলে দেবে প্রিয় কোনো কবির কবিতার বই কিংবা ভালোবাসার গল্প। অসাম্প্রদায়িক উৎসবের রং ছড়িয়ে পড়বে শহর জুড়ে।

শুধু প্রকৃতি আর মনে নয়, বাঙালির জাতীয় ইতিহাসেও বসন্তের রয়েছে গুরুত্ব। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে বাঙালি জাতি প্রতি বছর পয়লা ফাল্গুন পালন করে। আর এবার ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে পয়লা ফাল্গুনে উৎসব কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। দিনটিকে বরণ করে নিতে নানা আয়োজন করা হয়েছে রাজধানীসহ সারা দেশেই। বাঙালি এবার একই সঙ্গে মাতবে ফাল্গুনী ভালোবাসায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *