কুড়িগ্রাম বারের সভাপতির ছেলেকে অপহরণ, ‘নৌকা’ কোডে মুক্তিপণ দাবি

কুড়িগ্রাম বারের সাধারণ সম্পাদক ফখরুল ইসলামের একমাত্র ছেলে এবং শ্যালককে চারদিন আগে অপহরণ করা হয়েছে। অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা ‘নৌকা’ কোড ব্যবহার করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করছে।চাঞ্চল্যকর এই ঘটনা রাজধানী মোহাম্মদপুর থানায় শুক্রবার গভীর রাতে একটি মামলা হয়েছে।

ফখরুল ইসলামের ছেলের নাম মোহা. তানজিম আল ইসলাম দিবস (১৭)। শ্যালকের নাম খালিদ হাসান ধ্রুব।

দিবস রাজধানীর ভার্টিক্যাল হরিজন (ভিএইচ) ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ‘এ’ লেভেলের শিক্ষার্থী। পাশাপাশি সে বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কে আইসিটি কো-অর্ডিনেটর পদে চাকরি করছে। তাছাড়া ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশে লাইব্রেরি আনলিমিটেড প্রজেক্টের প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করে।

বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অপহরণকারী চক্রের সদস্যদের ধরতে রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অন্যান্য সদস্যরা।

দিবসের ঘনিষ্ঠ সূত্র এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংশ্লিষ্ট সূত্র যুগান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, গত ২১ জানুয়ারি সকাল ১০ টার দিকে ঝিগাতলার নতুন রাস্তার বাসা থেকে বের হয়ে মহাখালীস্থ ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে একটি কাজে যায় দিবস। কাজ শেষে দুপুর ২টার দিকে তার বোন চেমন ফাবিয়া ইসলাম মেঘলার সঙ্গে তার কথা হয়। সে জানায় মোহাম্মদপুরে তাজমহল রোডে তার আরেকটি কাজ আছে। ওই কাজ শেষে মামা খালিদ হাসান ধ্রুবকে সঙ্গে নিয়ে সে বাসায় ফিরবে।

পরে বাবা ফখরুল ইসলাম এবং বোন মেঘলা বেশ কয়েক দফায় দিবসকে ফোন করলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তাকে না পাওয়া গেলে তার মা কাউসার পারভিন তুহিন, ছোট ভাই খাইরুল ইসলামসহ কুড়িগ্রামের বাসা থেকে ফখরুল ইসলাম ঢাকা উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

পথিমধ্যে বারবার ফোন করার পর তারা দিবসকে পাননি। তারা ঢাকায় পৌঁছার আগেই মেঘলাকে জানায় সে যেন বিষয়টি মোহাম্মদপুর থানা পুলিশকে জানায়।

থানা পুলিশ প্রযুক্তির সহায়তায় জানতে পারে, দিবসের অবস্থান মণিপুরি পাড়া এলাকায়। সেখানে পুলিশ পাঠিয়ে তল্লাশি করেও তাকে পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় তেঁজগাও থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।

পরে প্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ জানতে পারে, তার অবস্থান মোহাম্মদপুর থানা এলাকায়। এরপর জিডিটি মোহাম্মদপুর থানায় ফরওয়ার্ড করা হয়। মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ কয়েকটি জায়গায় অভিযান চালিয়েও দিবসকে উদ্ধার করতে পারেনি।

পরে দিবসের স্বজনরা পুলিশের মাধ্যমে জানতে পারেন, দিবসের অবস্থান বারবার পরিবর্তন হচ্ছে। দিবসের স্বজনরা ওইদিন সারারাত থানায় অবস্থান করেন। ২২ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৩টার দিকে দিবসের মায়ের নম্বরে দিবসের নম্বর থেকে অপরিচিত একজন ফোন করে জানায় দিবস এবং তার মামা ধ্রুবকে অপহরণ করা হয়েছে।

ওই সময় দিবসের বাবা দিবসের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও কথা বলতে দেয়া হয়নি। পরদিন দিনের যে কোনো সময় কথা বলিয়ে দেবে বলে অপহরণকারীরা আশ্বাস দেয়।

পরদিন দিবাগত রাত পৌনে ৩টার দিকে দিবসের মায়ের নম্বরে আরেকটি কল আসে। কল ধরে দিবসের বাবা ফখরুল ইসলাম। এই সময় অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা দিবসের বাবাকে গালিগালাজ করেন।

গালিগালাজের কারণ জানতে চাইলে অপহরণকারীরা বলেন, ‘থানায় জিডি করেছিস কেনো? ডিবি, পুলিশ, র‌্যাব তোর ছেলে এবং শ্যালককে উদ্ধার করতে পারবে না। আমরা তোর ছেলে এবং শ্যালককে হত্যা করব।’

দিবসের বাবা বারবার অনুরোধের এক পর্যায়ে অপহরণকারীরা দিবসকে তার বাবার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেয়।

অপহরণকারীরা বলে ‘আমরা যেভাবে বলবো সেভাবে কাজ করবি। কোনো চালাকি করার চেষ্টা করবি না। আমাদের কোড নম্বর ‘নৌকা’। এই কোড দিয়ে দেশের যে কোনো ব্যক্তি যে কোনো জায়গা থেকে আপনার সঙ্গে কথা বলবে। যেভাবে বলবে সেভাবেই কাজ করবেন। নাহলে ছেলেকে পাবেন না।’

এরপর ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পরদিন সকাল ৭ টার দিকে আরেকটি নম্বর থেকে দিবসের মায়ের নম্বরে কল আসে।

কল রিসিভ করতেই ‘নৌকা’ কোড নম্বর পরিচয়ে বলে, ‘আপনার ছেলেকে সুস্থভাবে ফেরত পেতে হলে আজ বিকাল ৫টার মধ্যে ৫০ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দিতে হবে। না হলে ছেলের লাশ পাবেন।’

শুক্রবার রাত পৌনে ১০টার দিকে আরেকটি নম্বর থেকে দিবসের মায়ের নম্বরে ফোন করে জানতে চান, ‘আপনারা কেন পুলিশের কাছে গিয়েছেন?’ এরপরই গালিগালাজ শুরু করে। একপর্যায়ে জানতে চান টাকা জোগাড় করেছেন কি না?

এ সময় দিবসের বাবা জানান, কিছু টাকা জোগাড় করেছি। তখন অপহরণকারীর এক সদস্য হুমকি দিয়ে বলে রাত ১০টার মধ্যে ৫০ লাখ টাকা নিয়ে টাঙ্গাইল বাস স্টেশনে অপেক্ষা করুন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাউকে এ বিষয়টি জানালে আপনার ছেলে এবং শ্যালককে ফেরত পাবেন না। এরপর টাকা দেয়ার জন্য আরও ১২ ঘণ্টা সময় বাড়িয়ে নেয় দিবসের বাবা-মা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শুক্রবার রাতে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) বিপ্লব বিজয় তালুকদার যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই।

মোহাম্মদপুর থানার ওসি আবদুল লতিফ বলেন, এ বিষয়ে শুক্রবার গভীর রাতে একটি মামলা করেছেন দিবসের বাবা ফখরুল ইসলাম। তবে ভিকটিমদের উদ্ধার এবং আসামিদের গ্রেফতারের স্বার্থে এই মুহূর্তে কোনো তথ্য দেয়া যাচ্ছে না।

জানতে চাইলে ডিবির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহাদাত হোসেন সুমা যুগান্তরকে বলেন, ভিকটিমদের উদ্ধার এবং আসামিদের গ্রেফতারে আমরা বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালাচ্ছি। কিন্তু অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা বারবার অবস্থান পরিবর্তন করার কারণে তাদের বিষয়টি কষ্টসাধ্য হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *