তুমুল বৃষ্টি আরও দুই দিন

4

বর্ষাকালে বৃষ্টি হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এবার বৃষ্টি বুঝি একটু নির্দয়ভাবেই ঝরছে। একদিকে উজান থেকে আসা বন্যা, অন্যদিকে উজান-ভাটিতে সমানতালে তুমুল বৃষ্টি। বাংলাদেশ তো বটেই, ভারত-নেপাল থেকে চীন পর্যন্ত এই বৃষ্টির দাপট শুরু হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, তুমুল বৃষ্টি আরও দুই দিন হতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, চলতি বছরে বৃষ্টি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হচ্ছে। গত মে মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৭ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। জুনে তা একটু কমলেও স্বাভাবিকের চেয়ে ২ শতাংশ বেশি ছিল। আর জুলাই মাস এখনো শেষ না হলেও এ পর্যন্ত যা বৃষ্টি হয়েছে, তা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি।

এই বাড়তি বৃষ্টি মে-জুন মাসে ফসলের জন্য শক্তি জুগিয়েছে, এবার প্রায় সব ফসলেরই বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু জুলাই মাসের বাড়তি বৃষ্টি বন্যার তীব্রতাকেই শুধু বাড়াচ্ছে না, একই সঙ্গে রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ তৈরি করছে। আবার মাঠে থাকা সবজিসহ অন্যান্য ফসলের জন্য বিপদ ডেকে এনেছে।

আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, সাধারণত দুই থেকে তিন বছর পরপর মৌসুমি বায়ু অনেক শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তখন বৃষ্টি বেশি হয়। এ বছরটা সেই শক্তিশালী মৌসুমি বায়ুর মধ্যে পড়েছে। মৌসুমি বায়ু ভারত ও বাংলাদেশে প্রবেশ করে সাধারণত আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর দিয়ে। আরব সাগরের বায়ু ভারতের গুজরাট ও মহারাষ্ট্র দিয়ে প্রবেশ করে মধ্যপ্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে বৃষ্টি ঝরায়। আর বঙ্গোপসাগর থেকে আসা মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের টেকনাফ, ভারতের মিজোরাম ও মিয়ানমারের আরাকান উপকূল দিয়ে প্রবেশ করে। সাধারণত মৌসুমি বায়ুর এই দুটি ধারা একসঙ্গে শক্তিশালী হয় না, সংযুক্তও হয় না। যে বছর তা ঘটে, সেই বছর বাংলাদেশ, ভারত, নেপালসহ পুরো অঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও বন্যা হয়।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক প্রথম আলোকে বলেন, আরব সাগর থেকে আসা মৌসুমি বায়ু ভারতের গুজরাট থেকে আশপাশের এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে। একই সময়ে বঙ্গোপসাগরের মৌসুমি বায়ুও বেশ শক্তিশালী অবস্থায় আছে। এ কারণে এবারের বৃষ্টি ও বন্যাটা প্রকোপ একটু বেশি হবে।

বন্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত-নেপাল ও চীনের বৃষ্টির বড় অংশ ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বাংলাদেশে বন্যার পানি ৯৩ শতাংশ উৎস হচ্ছে ওই উজানের বৃষ্টির ঢল। বাংলাদেশের ভেতরের বৃষ্টি বন্যায় মাত্র ৭ শতাংশ পানির জোগান দেয়। আর এই পুরো অঞ্চলের বৃষ্টির পানি বঙ্গোপসাগরে নামার সবচেয়ে বড় পথ হচ্ছে বাংলাদেশ। এবার মৌসুমি বায়ু শক্তিশালী হওয়ায় এবং বৃষ্টি বেশি হওয়ায় নদ-নদীগুলো আগে থেকেই পানিতে পরিপূর্ণ ছিল। এক মাস ধরে থেমে থেমে ভারী বৃষ্টির ফলে তা বন্যায় রূপ নিয়েছে।

গতকাল দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় ৮০ থেকে ১২২ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে সিরাজগঞ্জে, ১২২ মিলিমিটার। রাজধানীতে বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ৮৭ মিলিমিটার। এই বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন অংশে জলাবদ্ধতার কারণে গতকাল দুপুর পর্যন্ত যান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। এতে নগরবাসীকে দুর্ভোগে পড়তে হয়।

বন্যা পরিস্থিতি

দেশের ২০টি জেলার ৩০ লাখের বেশি মানুষ বন্যার কারণে এখন পানিবন্দী অবস্থায় আছে। বন্যায় এখন পর্যন্ত মারা গেছে ২২ জন। বন্যার ভয়াবহতা বাড়লেও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষের উপস্থিতি বাড়েনি। গত তিন দিনে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আজ বুধবার ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, যমুনা ও পদ্মা অববাহিকায় পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এতে নদীতীরবর্তী ২০টি জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। সংস্থাটি দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর ১০১টি পয়েন্টে পানির উচ্চতা মাপে, তাতে দেখা গেছে, গতকাল ২৮টি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, বন্যার যে আরেকটি ঢল শুরু হয়েছে, তাতে আগামী তিন-চার দিন ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার পানি বাড়বে। দেশের ভেতরেও ভারী বৃষ্টি শুরু হওয়ায় উজানের পানির সঙ্গে মিশে তা বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাতে পারে।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে