পুলিশ হ’ত্যার টার্গেট নিয়েছে নব্য জেএমবি, গ্রেপ্তার ৩

চট্টগ্রাম নগরীতে ট্রাফিক পুলিশ বক্সে বি’স্ফোরণের ঘটনায় ৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগ। ৩ জনের মধ্যে একজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং আরেকজন বেসরকারি একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সদস্য। ৩ জনই নিষি’দ্ধ ঘোষিত জ’ঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির সদস্য বলে জানায় পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছে, ট্রাফিক বক্সে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ইম্প্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইসের (আইইডি) বি’স্ফোরণ ঘটানো হয়। চট্টগ্রামে প্রাথমিকভাবে সংগঠিত হওয়া নব্য জেএমবির মূল টার্গেট হচ্ছে পুলিশ।

রোববার (৩ মে) বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নগরীর বাকলিয়া থানার ডিসি রোডে একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) হাসান মো. শওকত আলী।

গ্রেপ্তার ৩ জন হল- মো. সাইফুল্লাহ (২৪), মো. এমরান (২৫) ও মো. আবু ছালেহ (২৫)।

কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগের ডিসি হাসান মো. শওকত আলী জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার সাইফুল্লাহ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার দক্ষিণ ঢেমশা গ্রামের মো. ইছহাক মিয়ার ছেলে। সে নগরীর চকবাজারে নুরা এন্টারপ্রাইজ নামে একটি কম্পিউটারের দোকানে চাকরি করে। এমরান সাতকানিয়া উপজেলার দক্ষিণ মরফলা গ্রামের মনির আহমেদের ছেলে। সে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অষ্টম সেমিস্টারের ছাত্র। আবু ছালেহ সাতকানিয়া উপজেলার উত্তর ঢেমশা মাইজপাড়া গ্রামের মহরম আলীর ছেলে। সে ন্যাশনাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের টেক্সটাইল বিভাগের সপ্তম সেমিস্টারের ছাত্র।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার) রাতে চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশ থানার ষোলশহর ২ নম্বর গেইট এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ বক্সে বি’স্ফোরণে কমপক্ষে ৫ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২ জন সেখানে কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্য। এরা হলেন- সার্জেন্ট আরাফাত হোসেন ও এএসআই মো. আতাউদ্দিন। এছাড়া ১০ বছরের এক শিশু এবং আরও ২ যুবক আহত হন। ঘটনার পরদিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ’ঙ্গি কার্যক্রম নজরদারি সংস্থা ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ’ জানিয়েছিল- জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট এই হাম’লার দায় স্বীকার করেছে।

তবে ৩ জনকে গ্রেপ্তারের পর কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগ বলছে, এই হাম’লার পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন সবই নব্য জেএমবির। এর সঙ্গে আইএস-এর সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

গ্রেপ্তার ৩ জনকে জিজ্ঞাসা’বাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) পলাশ কান্তি নাথ জানান, পলাতক সেলিম, জহির ও আকিবের মাধ্যমে এমরান ও সাইফুল্লাহ নব্য জেএমবির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। আর আবু ছালেহকে সংগঠনে আনে সাইফুল্লাহ।

ঘটনার দিন সকালে সেলিম ও সাদেকের সঙ্গে আরও ৩ জন নগরীর পূর্ব নাসিরাবাদের আপন নিবাসে এমরানের বাসায় আসে। তারা সঙ্গে করে হোমমেড আইইডি নিয়ে যায়। সেলিম কীভাবে আইইডি’র বি’স্ফোরণ ঘটাতে হবে সেটি শিখিয়ে দেয় এমরানকে। জুমার নামাজের পর তারা নগরীর বিভিন্ন এলাকা রেকি করে ২ নম্বর গেইটে ট্রাফিক বক্স বি’স্ফোরণের জন্য নির্ধারণ করে।

বিকেলে নব্য জেএমবির সদস্য পলাতক আবু ছাদেক ট্রাফিক বক্সের ভেতরে টেবিলের নিচে আইইডি রেখে আসে। এমরানের হাতে রিমোট কন্ট্রোলার দিয়ে তাকে আইইডি বি’স্ফোরণের নির্দেশ দেয় সেলিম। কিন্তু এমরান বি’স্ফোরণ না ঘটিয়ে সেটি নাসিরাবাদের আপন নিবাসের সামনে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। পরে সাইফুল্লাহ গিয়ে এমরানের দেখানো ডাস্টবিন থেকে রিমোট কন্ট্রোলার উদ্ধার করে। সাইফুল্লাহ ট্রাফিক বক্সের দক্ষিণে যাত্রী ছাউনির পাশে দাঁড়িয়ে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে বো’মার বি’স্ফোরণ ঘটায়।

এ ঘটনায় ট্রাফিক পরিদর্শক অনিল বিকাশ চাকমা বাদি হয়ে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগের পরিদর্শক মো. আফতাব হোসেন বলেন, নব্য জেএমবির প্রায় ১০ জন সদস্যের নাম-পরিচয় আমরা পেয়েছি। ট্রাফিক বক্সে বি’স্ফোরণের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা ছিল।

এডিসি পলাশ কান্তি নাথ বলেন, চট্টগ্রামে নব্য জেএমবির সদস্যরা সংগঠিত হতে শুরু করেছিল। পুলিশ বক্সে বি’স্ফোরণ ছিল তাদের প্রথম হাম’লা। এরপর করোনা পরিস্থিতি শুরু হয়েছে। না হলে হয়তো তাদের আরও কোনো পরিকল্পনা ছিল। সব বিষয় এখন আমরা তাদের জিজ্ঞাসা’বাদের মাধ্যমে বের করব। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসা’বাদে গ্রেপ্তার ৩ জন জানিয়েছে, স্বপ্রণোদিতভাবে সংগঠনের আদর্শ বাস্তবায়ন এবং শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠা তাদের লক্ষ্য। দেশের প্রচলিত আই তাগুতের আইন এবং বাংলাদেশ পুলিশকে তাগুত বলে তারা মনে করে। এজন্য পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে তাদের হ’ত্যার পরিকল্পনা আছে নব্য জেএমবির।

তিনি জানান, অনলাইনে পাওয়া অ’প্রচলিত মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে তারা সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং কার্যক্রম চালায়। সেখানে ভিডিও আদানপ্রদানের মাধ্যমে তারা স্থানীয়ভাবে মালামাল সংগ্রহ করে আইইডি তৈরি করে। গ্রেপ্তার ৩ জনের কাছ থেকে আইইডি তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের পরিদর্শক আফতাব হোসেন জানান, বি’স্ফোরণের পর নব্য জেএমবির সব সদস্য নাসিরাবাদের আপন নিবাসের গিরি ভবনে এমরানের বাসায় মিলিত হয়। পরে এমরান ছাড়া সবাই সেখান থেকে চলে যায়। কয়েকদিন পর সাইফুল্লাহ পশ্চিম বাকলিয়ার ডিসি রোডে গণি কলোনির মুখে লতিফ বিল্ডিংয়ে একটি বাসা ভাড়া নেয়। করোনা ভাইরাসের প্রা’র্দুভাবের জন্য সাধারণ ছুটি শুরু হলে সবাই গ্রামের বাড়িতে চলে যায়। কিন্তু জহির তাদের ফোন করে এলাকা ছেড়ে যেতে বলে। এমরান ও আবু ছালেহ সাইফুল্লাহর বাসায় আশ্রয় নেয়। সেখান থেকে ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

জবানব’ন্দি গ্রহণের জন্য ৩ জনকে আদালতে হাজির করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ পরিদর্শক আফতাব হোসেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *