ভারতে ফ্যাসিবাদের লক্ষণ স্পষ্ট: নোয়াম চমস্কি

 

ফ্যাসিবাদ বলতে বোঝানো হয় সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্র। ভারতে ফ্যাসিবাদের আদর্শ পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি। কিন্তু এর লক্ষণ সুস্পষ্টভাবে দেখা দিয়েছে। এমনটাই মনে করেন মার্কিন বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ ও লেখক নোয়াম চমস্কি।

তিনি বলছেন, ভারতে ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য ব্যাপক হারে বেড়েছে। এরই মধ্যে আবির্ভূত হয়েছেন নরেন্দ্র মোদির মতো একজন রাজনীতিক, যিনি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ভোলাতে ব্যবহার করছেন ধর্মীয় বিভেদের অস্ত্র। আর এতে মাতোয়ারাও হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

সম্প্রতি যুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী অ্যাকটিভিস্ট কার্তিক রামানাথানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই মন্তব্য করেছেন নোয়াম চমস্কি। ওই সাক্ষাৎকারে চমস্কি বলেছেন, ‘ভারতে আমরা যা দেখছি, তা হচ্ছে ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ ছাড়াই ফ্যাসিবাদের লক্ষণ। ফ্যাসিবাদের অর্থ হচ্ছে, একটি সর্বাত্মকবাদী সরকারের রাষ্ট্রের সর্বত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। অর্থাৎ, নাৎসি বা কোনো ফ্যাসিবাদী দলের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র, যা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে। নাৎসিরা কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। অবশ্য ভারতে তা দেখা যাচ্ছে না। সেখানে রাষ্ট্র বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে না। কিন্তু ভারতে ফ্যাসিবাদের অন্যান্য লক্ষণ সুস্পষ্টভাবে দেখা দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থার ওপর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দেশটির গণমাধ্যমও সেভাবে সরকারের সমালোচকের স্থান নিতে পারছে না।’ এ সময় দেশটিতে লাখ লাখ মুসলিম নাগরিককে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে শনাক্ত করে তাদের জন্য বন্দিশিবির তৈরির বিষয়টি উল্লেখ করেন নোয়াম চমস্কি।

কাউন্টারকারেন্ট ডট ওআরজিতে প্রকাশিত হয়েছে এই সাক্ষাৎকার। নোয়াম চমস্কি অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক। পাঁচ দশক ধরে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) শিক্ষাদানের পাশাপাশি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কঠোর সমালোচক হিসেবেও পরিচিত।

ডানপন্থী ও বিভিন্ন দেশে নব্য ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীগুলো সম্পর্কে চমস্কি বলেন, প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব একটি বিশেষ ইতিহাস রয়েছে। ভারত হাঙ্গেরি বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো নয়। সেখানে মানুষে মানুষে বৈষম্য গত কয়েক দশকে ব্যাপক হারে বেড়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প বা নরেন্দ্র মোদির মতো রাষ্ট্রনায়ক কেন ভোটের রাজনীতিতে সফল হচ্ছেন—সেটিরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন নোয়াম চমস্কি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে একই ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন মুলুকের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর ও সক্রিয়। কিন্তু গত কয়েক দশকে এই দেশের শ্রমিক শ্রেণি ও পেটি বুর্জোয়ারা এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে তেমন কোনো সুবিধা পায়নি। ফলে এসব শ্রেণির মানুষেরা কার্যত ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ। এই রাগের বহিঃপ্রকাশ তারা ঘটাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো রাষ্ট্রনায়কের মধ্য দিয়ে। কারণ ট্রাম্প তাদের বলছেন যে, শ্রমিক ও পেটি বুর্জোয়াদের এই বঞ্চনার সব দোষ হিস্পানিকদের, দোষ কৃষ্ণাঙ্গদের। অভিবাসীদের ঘাড়ে পুরো দোষ চাপিয়ে নিজের ব্যর্থতা আড়াল করছেন ট্রাম্প। তিনি বঞ্চিত ও ক্ষুব্ধ মানুষের ক্ষোভকে রাজনীতিতে ব্যবহার করছেন। ঠিক একইভাবে ভারতের বঞ্চিত শ্রেণির মানুষের হাতে বিভেদের অস্ত্র তুলে দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলছেন, মুসলমানদের কারণেই হিন্দুরা তাদের প্রাপ্য পাচ্ছে না। এভাবেই হিন্দুত্ববাদের জোয়ারে ভাসছে পুরো ভারত।

ভারতের মধ্যবিত্তদের প্রসঙ্গে চমস্কি বলছেন, দেশটির মধ্যবিত্তরা সম্পদশালী হয়েছে—এটা সত্য নয়। ভারতের মধ্যবিত্তদের পরিস্থিতি মূলত স্থবির বলেই মনে করেন তিনি। চমস্কির মতে, ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলের পরিস্থিতি বেশ খারাপ। দেশটিতে শত শত কৃষক এ কারণে আত্মঘাতী হচ্ছে।

কাশ্মীর প্রসঙ্গে এই বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদ বলেন, ভারত অধিকৃত কাশ্মীর এখন একটি বিরাট কারাগারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এতে দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ সমর্থন রয়েছে। চমস্কি মনে করেন, ভারতের সাধারণ মানুষ আসলে কাশ্মীরের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতে পারছে না। তারা ততটুকুই জানছে, যতটুকু তাদের জানানো হচ্ছে।

নোয়াম চমস্কি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দশমিক ১ শতাংশ মানুষের হাতে দেশটির মোট সম্পদের ২০ শতাংশ রয়েছে। দেশটির অর্ধেক মানুষের সম্পদের হার নেতিবাচক। ১৯৭০ সালের দিকে মানুষের যে ক্রয়ক্ষমতা ছিল, এখনকার মার্কিন মজুরি সে পর্যায়ে চলে এসেছে।

চমস্কির মতে, সম্পদের ঘনত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর গণতন্ত্রকে অবনতির দিকে পরিচালিত করে। কারণ সম্পদশালী ব্যক্তিরা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার আধিপত্য দেখানোর প্রবণতা শুরু করে।

এসব থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে একটি জনপ্রিয় আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন নোয়াম চমস্কি। তবে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে এমন গণ-আন্দোলন সংঘটিত হওয়া বেশ কষ্টসাধ্য বলেও মনে করেন এই বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *