মামলার জটমুক্তির বছর হোক মুজিব বর্ষ

মুজিববর্ষ বাঙালি জাতির মনে নতুন গতির সঞ্চার করেছে বলে মনে হয়। সব ক্ষেত্রে ইতিবাচক মন মানসিকতা পোষণ করে ২০২০ সালে বাংলার মানুষ মুজিব বর্ষ পালন করছে। পুলিশ বলছে মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার পুলিশ হবে জনতার ইত্যাদি। ২০২০ সালে সামগ্রিকভাবে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে যে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষণীয় তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সেজন্য প্রথমে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী রাজনৈতিক আদর্শকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।

যিনি সরকারি চাকরি করেন আমলা, পুলিশ, বিচারক, আইনজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ এবং সকল পেশাজীবী শ্রমজীবী মানুষ মনে করছে এই মুজিব বর্ষ ঘিরে শপথ নেব কোনো দুর্নীতি, অন্যায় ও অপকর্ম করবো না এবং জনগণের সেবায় নিয়োজিত থেকে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার সরকারকে সকল সেক্টরে সহযোগিতা করবো। যাতে করে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত ও টেকসই হয়। বিচার বিভাগ শপথ নিয়েছে এই বছরে অধিকসংখ্যক মামলা মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করে জনগণকে মামলাজট থেকে রেহাই দেব। দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির মাধ্যমে দেশকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্ত করবো।

অপরাধী যেই হোক তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। এই স্লোগানে বা প্রতিপাদ্যে বাংলাদেশের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থা এগিয়ে চলেছে। অপরাধ করলে তার বিচার না হওয়া বা না করা এক ধরনের অভিশাপ ও ব্যাধি। অপরাধীর বিচারের মুখোমুখি করা সময়ের দাবি। রাষ্ট্র এখানে সোচ্চার। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ১২ বছর বা এক যুগ পেরিয়ে গেছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের মামলা নিষ্পত্তির পরিসংখ্যান হতে দেখা যায় শুধু জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে ৮৮ লক্ষাধিক মামলা। মামলা নিষ্পত্তি হার গড়ে ৯৫ শতাংশের বেশি। ১৯৯০-২০০৭ পর্যন্ত শাসন বিভাগ দ্বারা পরিচালিত ম্যাজিস্ট্রেসির নিষ্পত্তির হার ছিল ৮৭ শতাংশের কাছাকাছি। তবে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসি ১ নভেম্বর ২০০৭ নির্বাহী বিভাগ হতে পৃথক হওয়ার দিন থেকে অদ্যাবধি মামলা নিষ্পত্তির হার কোনো কোনো বছর ১০০ শতাংশ অতিক্রম করেছে।

বর্তমান ফৌজদারি বিচার বিভাগে মামলা নিষ্পত্তির হার শতভাগ হওয়ায় এই কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, অপরাধ করে বিচারের মুখোমুখি না হওয়ার সংস্কৃতি থেকে বাংলাদেশ বের হতে পেরেছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিবন্ধকতা বলে গণ্য হয়। যেকোনো দেশের সভ্যতার মানদণ্ড বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সাথে সম্পর্কযুক্ত।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ন্যায়বিচারের কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেন. ‘যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, সে একজনও যদি হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।’

তাই ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে দায়-দায়িত্ব রয়েছে। তেমনি জনগণের আস্থার প্রতিও বিচার বিভাগের দায়ভার রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু আরও বলেছিলেন, বিচার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে হলে আপিলের স্তর কমাতে হবে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন আপিলের স্তর বাড়লে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। মানুষ হয়রানির শিকার হয়। মামলার বয়স ও দীর্ঘসূত্রিতা বাড়ে কিন্তু বিচার প্রার্থীর আয়ু কমে। সে কারণে তিনি বিচার বিভাগকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি জানতেন দ্রুতবিচার নিশ্চিত করতে পারলে দেশে বিচারহীনতা কমবে। আদালতের ওপর মানুষের আস্থা বহুগুণে বাড়বে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ন্যায়বিচার পাবে।

ইয়াসমিন আক্তার ১৪ বছরের মেয়ে ঢাকায় গৃহপরিচারিকার কাজ করতো। দিনাজপুরের দশমাইল নিজ এলাকায় ফিরছিল ২৪ আগস্ট ১৯৯৫ সালে। পথিমধ্যে পুলিশ ভ্যানে করে পৌঁছে দেয়ার জন্য তাকে উঠিয়ে নেয়। পরে পুলিশ সদস্যরা ইয়াসমিনকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করে হত্যা করে। ২৫ আগস্ট ১৯৯৫ সালে স্থানীয় পত্রিকা দৈনিক উত্তর বাংলায় পুলিশ কর্তৃক ধর্ষণের ঘটনাটি প্রকাশিত হয়। ওই ঘটনা নিয়ে ধর্ষণসহ হত্যা মামলা হলে ঘটনার দুই বছর পর ১৯৯৭ সালে দুজন পুলিশ সদস্য ধরা পড়ে। তদন্তে পুলিশ সদস্যরা অভিযুক্ত হন এবং বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়ে আদালত তাদের ফাঁসির আদেশ দেন এবং ২০০৪ সালে পুলিশ সদস্যদের ফাঁসি বাংলার মাটিতে কার্যকর হয়। এখানে ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত পুলিশ সদস্যরাও অপরাধ করে পার পায়নি এবং তাদের বিচার হয়েছে। এখানে বিচার বিভাগের সফলতা। ভিকটিমের পরিবার বিচার পেয়েছে। অপরাধীরা শাস্তির মুখোমুখি হয়েছে। এটাই আইনের শাসন। ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ড দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘২৪ আগস্ট নারী নির্যাতন এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর দায়মুক্তি আইন বা ইনডেমনিটি আইন বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকার। ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী আ ফ ম মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মামলা করেন। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল তৃতীয় বিচারক মোহাম্মদ ফজলুল করিম ২৫ দিন শুনানির পর অভিযুক্ত ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ নিশ্চিত করেন। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর থেকে ২০০৯ সালের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত বাদী-বিবাদীর আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে চার দফায় রায় ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *