মোবাইল ইন্টারনেটের গতিতে টান, ফোর-জিতেও বাফারিং!

ব্রডব্যান্ড (উচ্চ গতি) ইন্টারনেটের গতি ঠিক থাকলেও ঠিক নেই মোবাইল ইন্টারনেট। মোবাইল ইন্টারনেটের গতি কমেছে, বিশেষ করে ডাউলোডে। ঢাকায় গত তিন দিন ধরে এই সমস্যা দেখা যাচ্ছে বলে ব্যবহারকারীরা অভিযোগ করেছেন। অন্যদিকে ঢাকার বাইরেও মোবাইল ইন্টারনেটের গতি কমে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে। ঢাকার বাইরে ফোর-জি নেটওয়ার্কে ২০-২৫ শতাংশ গতি কমেছে বলে জানা গেছে।

দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে বিশেষ করে সরকার ছুটি ঘোষণার পর রাজধানী থেকে প্রায় এক কোটি মোবাইলফোন ব্যবহারকারী ঢাকার বাইরে চলে যান। ঢাকার বাইরের নিজ জেলা-উপজেলার মানুষের পাশাপাশি বাড়তি এক কোটি থেকে এক কোটি ২০ লাখ মানুষ ঘরবন্দি। ফলে সেসব জায়গায় বিপুল সংখ্যক মানুষের চাপ বেড়েছে। একদিকে অতিরিক্ত মানুষের চাপ এবং ব্যবহারকারীদের বেশি বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার নেটওয়ার্কের ওপর চাপ তৈরি করায় গতি কমেছে। এছাড়া, মোবাইল অপারেটরগুলোর তরঙ্গ (স্পেক্ট্রাম) ঘাটতিও গতি কমার অন্যতম কারণ। সব অপারেটরেরই তরঙ্গ ঘাটতি রয়েছে। করোনা সংকট দীর্ঘায়িত হলে এবং অপারেটরগুলো বাড়তি তরঙ্গ না নিলে ফোর-জির গতি আগের অবস্থায় ফিরবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকার পাশাপাশি অন্তত ২১টি জেলায় এই প্রতিবেদক খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, সংশ্লিষ্ট জেলা, উপজেলার মোবাইল টাওয়ার সংলগ্ন এলাকা, শহরের কিছু বিশেষ জায়গায় অপারেটরগুলোর নেটওয়ার্কে ফোর-জি ভালো সেবা দিলেও বেশির ভাগ জায়গার অবস্থা খারাপ। অবস্থা এতোই খারাপ যে, ফোর-জি নেওয়ার্কেও ভিডিও দেখতে গেলে বাফারিং হয় বলে জানিয়েছেন অনেকে। কোনও কোনও উপজেলায় থ্রি-জি দেখালেও ব্যবহারের সময় ধীর গতি পাওয়া গেছে। উপজেলাগুলোতে থ্রি-জি থাকলেও ব্যবহারকারীরা বেশিরভাগ সময় টু-জি পান।

জানতে চাইলে মোবাইলফোন অপারেটরগুলোর সংগঠন অ্যামটবের মহাসচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এস এম ফরহাদ বলেন, ‘হঠাৎ করে দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী শহর থেকে গ্রামে চলে যাওয়ায় মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। অপারেটররা গ্রাহকদের কথা বিবেচনা করে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডেটার (ইন্টারনেট) দাম কমিয়ে বেশি ডেটা দেওয়ায় এর ব্যবহার বেড়ে যায়। এছাড়া, গ্রাহকরা অফিস, ব্যবসা, শিক্ষা, বিনোদন ও অন্যান্য অনেক কাজ ঘরে বসে অনলাইনে করছেন, যে কারণে ইন্টারনেটের ওপরও চাপ বাড়ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জানি, বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মোবাইলের ওপর নির্ভর করেন, যার জন্য পর্যাপ্ত ব্যান্ডউইথ প্রয়োজন। তবে ইচ্ছা ও প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত দামের কারণে অপারেটররা স্পেক্ট্রাম (তরঙ্গ) বরাদ্দ নিতে পারেনি। সামগ্রিকভাবে এ কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইন্টারনেটের গতি হ্রাস পাচ্ছে।’

মোবাইল অপারেটরগুলোকে ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করে এমন একটি আইআইজির (ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে) শীর্ষ এক কর্মকর্তা জানান, দেশের মোবাইল অপারেটরগুলোতে বর্তমানে (২৩ এপ্রিল সন্ধ্যায়) ৭০০ জিবিপিএস (গিগাবিটস পার সেকেন্ড) ব্যান্ডউইথ হচ্ছে। যথেষ্ট পরিমাণে বেড়েছে ব্যান্ডউইথের ব্যবহার মোবাইল অপারেটরগুলোতে, প্রায় ৩০০ জিবিপিএস। তিনি জানান, মোবাইল অপারেটরগুলো আগেই তাদের বাড়তি চাহিদা জানিয়ে ব্যান্ডউইথ বাড়িয়ে নিয়েছে। আর ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে ব্যবহার করা হচ্ছে এক হাজার জিবিপিএস। ওই কর্মকর্তা জানান, ব্রডব্যান্ডে ব্যান্ডউইথের ব্যবহার বাড়েনি। একটা পর্যায়ে গিয়ে স্থিতিশীল হয়ে আছে।

এ খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফোর-জি’র গতি কমে যাওয়ার পেছনে ব্যান্ডউইথের কোনও ঘাটতি নেই। ঘাটতি যা ওই তরঙ্গতেই। অপারেটরগুলো তাদের তরঙ্গ (স্পেক্ট্রাম) বাড়িয়ে নিলে ফোর-জিতে গতি বাড়বে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘‘যে পরিমাণ স্পেক্ট্রাম মোবাইল অপারেটরগুলোর আছে তা দিয়ে গ্রাহকদের ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। বহুদিন ধরে আমি এটা বলে আসছি। কিন্তু তারা বিষয়টি আমলে নেয়নি। জোড়াতালি দিয়ে চালিয়েছে। সেই ফল এখন ভোগ করছে। এ সময়ে গ্রাহকের চাপ বেড়েছে, ইন্টারনেট ব্যবহারের হার বেড়েছে। সেজন্যই ‘সার্ভিস ফল’ করেছে। অপারেটরগুলো যদি ‘কোয়ালিটি অব সার্ভিস’ দিতে চায়, তাহলে তাদের স্পেক্ট্রাম কেনার কোনও বিকল্প নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘গত নিলামের পর থেকে আমি অনেকবার বলেছি, ভালো সেবা দিতে হলে স্পেক্ট্রাম লাগবে। অপারেটরগুলো বিষয়টি কানে না তোলায় আজ এই পরিণতি। গ্রাহকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।’

জানা গেছে, বর্তমানে গ্রামীণফোনের রয়েছে ৩৭, বাংলালিংকের ৩০ দশমিক ৬, রবির ৩৬ দশমিক ৪ ও টেলিটকের ২৫ দশমিক ২ মেগাহার্টজ স্পেক্ট্রাম রয়েছে। ২০১৮ সালে এক নিলাম অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলালিংক ১০ দশমিক ৬ এবং গ্রামীণফোন ৫ মেগাহার্জ তরঙ্গ কেনার পর বর্তমান অবস্থা দাঁড়ায়। তখনও অনেক তরঙ্গ অবিক্রিত অবস্থায় থেকে যায়। নিলাম অনুষ্ঠান আয়োজনকারী টেলিযোগোযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির কর্মকর্তা আশা করেছিলেন, অন্য অপারেটররাও তরঙ্গ কিনবেন। কিন্তু দুটি অপারেটর ছাড়া অন্যরা তরঙ্গ কেনেনি। অপারেটরগুলোর তরঙ্গ ঘাটতি থেকেই যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপারেটররা অতিরিক্ত তরঙ্গ কিনেই কেবল ইন্টারনেটের গতি সমস্যার সমাধান করতে পারবে।

জানা গেছে, শুধু বাংলাদেশই নয়, ভারত, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কাসহ আরও কয়েকটি দেশে ফোর-জি’র গতি কমেছে। হংকংভিত্তিক টেলিযোগাযোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওপেন সিগন্যাল বলছে, গত ১ এপ্রিল ফোর-জি’র ডাউনলোড গতি ছিল অনেক কম, ৭ দশমিক ৮ এমবিপিএস। বাংলাদেশে ফোর-জি’র গতি হ্রাসের পরিমাণ ২০ শতাংশের বেশি হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: