যন্ত্রের দাপটে হারিয়ে হচ্ছে স্বরূপকাঠির ঐতিহ্যবাহী নৌকা

ধান, নদী, খালের এলাকা হিসেবে পরিচিত বরিশাল বিভাগের স্বরূপকাঠি বাসীর এক সময়ের যোগাযোগের বাহন হিসাবে পরিচিত নৌকা হারিয়ে যেতে বসেছে। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নযনের কারনে সর্বত্রই ছোঁয়া লেগেছে যন্ত্রের। যন্ত্রের দাপটে বেশির ভাগ নৌকা হারিয়ে গেলেও প্রত্যন্ত এলাকায় এখনো নৌকার প্রচলন রয়ে গেছে। আষাঢ় থেকে আশ্বিন পর্যন্ত ওই অঞ্চলের অনেক এলাকা পানিতে ডুবে যায়। ওইসব এলাকায় নৌকা না হলেই যেন নয়।

বিশেষ করে পেয়ারা মৌসুমে পেয়ারা পাড়তে ও বাজারে নিতে আটঘর কুড়িয়ানার মানুষের নৌকার বিকল্প নেই। যে কারনে প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে প্রতি শুক্রবার আটঘরে বসে নৌকার হাট।

এখানে নৌকা তৈরি কারিগর ও বেপারীগন নৌকা নিয়ে বিক্রি করেন। ওই হাট থেকে নৌকা কেনার জন্য স্বরূপকাঠি, ঝালকাঠি এলাকা ছাড়াও দক্ষিনাঞ্চলের বহু এলাকা থেকে নৌকা কিনতে আসেন অসংখ্য মানুষ। আর নৌকার তৈরির জন্য উপজেলার উত্তর পশ্চিম সীমান্তের ৮ টি গ্রামের কাঠ মিস্ত্রিীরা আজো ধরে রেখেছে নৌকা তৈরির শেষ প্রান্তটি।

বাংলার শস্য ভান্ডার খ্যাত বরিশাল বিভাগের একটি উপজেলার নাম স্বরূপকাঠি। এ জনপদের বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে অসংখ্য নদী নালা, খাল। উপজেলার সদর সংশ্লিষ্ট চার-পাঁচটি ইউনিয়নে যৎসামান্য রিকশা, ভ্যান, অটোরিকসা চলাচল করলেও শতকরা ৭৫ ভাগ এলাকার যোগাযোগের প্রধান বাহন এখনো নৌকা।

এ উপজেলায় মানুষের চলা চল আর মালামাল পরিবহনের জন্য যুগ যুগ ধরে কাঠামী, বাছারী, হাইল আলা, পদি, হাত বৈঠা, ডোঙ্গা, ডিঙ্গী, টাবুইরা, পানশি, পেনিচ, কোষা, টালাইসহ বিভিন্ন নামের নৌকা ব্যবহার করা হত।

সুন্দরবন থেকে কাঠ ও গোলপাতা সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করা হত কাঠামী, বাছারী, পদি আর হাইলআলা নৌকা। একসময় পারিবারিক আভিজাত্যের নিদর্শন হিসেবে একটি ডিঙ্গি বা পানশি নৌকা না থাকলে যেন সস্তি ছিলনা সম্ভ্রান্ত পরিবারের কর্তা ব্যাক্তির। ওইসব নৌকায় এ্যালমুনিয়াম/পিতল দিয়ে সুন্দর সুন্দর নকশি তৈরি করা হত।

ভাল কাজ করার মিস্ত্রী পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হত। যান্ত্রিক নৌকার (ট্রলার) প্রচলন হওয়ায় ওইসব নৌকার প্রচলন প্রায় শেষ হয়ে গেছে। বেশিরভাগ নৌকার বিলুপ্তি ঘটলেও কোষা, পেনিচ নৌকার প্রচলন এখনও রয়ে গেছে।

শতাধিক বেপারী ও মিস্ত্রীর মত ডুবি এলাকার শাহজাহান, উরিবুনিয়ার কামাল,বৈঠাকাটার সোলায়মান নৌকা নিয়ে এসেছেন আটঘর হাটে। তারা জানান, ইন্দুরহাট থেকে পেকিং (বড় গাছের ডালপালা) কাঠ কিনে মিলে চেরাই করে বা পেকিং কাঠের তক্তা কিনে ডামিশ (তারকাটা) লোহা দিয়ে বাড়ী বসে তৈরি করা এক একটি নৌকার জন্য খরচ হয় দুই থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। বাজারে ওই নৌকা ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। লোহা ও কাঠের মূল্য এবং শ্রমিকের মজুরী দেয়ার পরে তেমন মুনাফা হয়না। নিজদের মজুরীর অংশটা থাকলেই তারা সন্তুষ্ট।

আটঘরহাটে নৌকা নিয়ে আসা আব্দুল গাফ্ফার জানান তিনি গ্রামে মিস্ত্রিদের দাদন দেন। মিস্ত্রিরা তৈরি নৌকা তার কাছে বিক্রি করেন। তিনি জানান বিক্রি মূল্যের শতকরা ১০ ভাগ হিসেবে দাদন দানকারী ব্যবসায়ীরা পান। বছরের ৪/৫ মাস চলে তাদের কার্যক্রম।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: