৪৭৮ কোটি টাকা লুটের মহা-আয়োজন

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় সরকারের অগ্রাধিকারভুক্ত ১০ মাধ্যমিক স্কুল নির্মাণ প্রকল্পে নজিরবিহীন সাগর চুরির মহা-আয়োজনের ঘটনা ধরা পড়েছে। একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদনে সরকারের প্রায় ৪৮০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে নীলনকশার তথ্য প্রকাশ করা হয়।

দুর্নীতি করতে গিয়ে আলোচিত এই প্রকল্পের জমিতে থাকা একটি কড়ই গাছের ক্ষতিপূরণ ধরা হয়েছে ৪ কোটি টাকা। একটি নারকেল গাছের দাম ধরা হয় প্রায় কোটি টাকা।

একটি টিনশেডের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দাম ধরা হয় ২ কোটি টাকা। অথচ চাঞ্চল্যকর এই দুর্নীতির ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী প্রকল্প পরিচালক ড. আমিরুল ইসলাম এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছেন। রহস্যজনক কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি।

প্রসঙ্গত, ঢাকার নিকটবর্তী সরকারের ১০ স্কুল নির্মাণে প্রস্তাবিত প্রকল্প ব্যয় নিয়ে ‘জমি অধিগ্রহণে ৩শ’ কোটি টাকা লোপাটের আয়োজন’ শিরোনামে গত ৩০ ডিসেম্বর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

এরপর গোয়েন্দা সংস্থা অনুসন্ধানে নেমে আরও ভয়াবহ তথ্য উদ্ঘাটন করে। পৃথক ১০টি চৌকস গোয়েন্দা টিম এই প্রকল্প নিয়ে অনুসন্ধান শেষে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে।

সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে ৪৭৮ কোটি ৬৮ লাখ ৯ হাজার ৭৪৫ টাকা সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে লুটপাটের নীলনকশার কথা বলা হয়।

সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি রোধে প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়, সরকারি প্রকল্পগুলোয় প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে তার ব্যক্তিগত তথ্য, সততা, চারিত্রিক গুণাবলি, পারিবারিক পরিচিতি ইত্যাদি যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পর্কে সময় সময় গোয়েন্দা তথ্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে দাখিলের নির্দেশনা প্রদান করা।

উল্লিখিত প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদারকি কমিটি গঠন করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কর্তৃক প্রকল্পের কার্যক্রম পরিদর্শন ও সরকারের উচ্চপর্যায়ে নিয়মিত বাস্তবায়ন প্রতিবেদন দাখিলের ব্যবস্থা রাখা।

মতামত প্রকাশ করে বলা হয়, অনুসন্ধানকালে ওই প্রকল্পগুলোয় ব্যাপক অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠেছে। সরকারি অর্থের যথেচ্ছ অপব্যবহার ও লুটপাটের এ ধরনের নীলনকশা এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে ব্যাপক অন্তরায়।

এতৎসংশ্লিষ্ট সবাইকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা। এ ছাড়াও এ ধরনের বড় বড় প্রকল্পে সরকারের গভীর নজরদারি বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন।

প্রতিবেদনের এক স্থানে বলা হয়, সহযোগী অধ্যাপক ড. আমিরুল ইসলাম প্রকল্প পরিচালক হিসেবে যোগদানের পর প্রকল্পের সঙ্গে সংযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারিরা জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেন।

তিনি ইতোমধ্যে ১৩ কোটি ৩৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ব্যয় করেছেন। ওই প্রকল্পের আওতায় ১০টি স্কুল স্থাপনের জন্য ১০টি জমি অধিগ্রহণের নিমিত্তে মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসনিক অনুমোদনও আনা হয়।

অভিযোগ আছে, এক্ষেত্রে ৭টি জমি নাল হলেও জমির শ্রেণি গোপন করে মূল্য নির্ধারণের সময় নাল, ডোবা, পুকুর শ্রেণির জমিকে ভিটে মাটি দেখিয়ে এবং অবকাঠামো ও গাছপালার অবিশ্বাস্য মূল্য বাড়িয়ে সরকারি বিপুল অর্থ লোপাটের প্রক্রিয়া করা হচ্ছিল।

প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৬৭৩ কোটি ৪৬ লাখ ৪৬ হাজার টাকা নির্ধারণ হলেও আরডিপিপিতে (সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রফর্মা) ৬৭ দশমিক ০১% ব্যয় বৃদ্ধি দেখিয়ে ১ হাজার ১২৪ কোটি ৭৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা খুবই অস্বাভাবিক বলে প্রকল্পবোদ্ধাদের অভিমত।

বলা হয়, খিলক্ষেত থানার জোয়ারসাহারায় প্রস্তাবিত স্কুলের জন্য জমির প্রকৃত দাম ৪৭ কোটি ৭৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা। আর গাছপালা ও অবকাঠামোর মূল্য হতে পারে ১১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা।

কিন্তু পিডি আমিরুল ইসলাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখার সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় দুই একর জমির জন্য ৩৬৫ কোটি ৭৩ লাখ ৭৩ হাজার ২০০ টাকা প্রস্তাব করেন।

এছাড়া ১১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা গাছপালার স্থানে ৬০ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়। এই ২ একর জমিতেই সরকারের ক্ষতি হবে ৩১৭ কোটি ৯৯ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ টাকা। এই জমিতে ১৫টি কড়ই গাছের প্রতিটির দাম ধরা হয় ৪ কোটি টাকা করে।

বাড্ডার সাঁতারকুল মৌজার ২ একর জমি ভূমি অফিসের পর্চা অনুযায়ী কিছু অংশ নাল শ্রেণির। এছাড়া অধিকাংশ জমির শ্রেণি ডোবা। যার প্রতি শতাংশের মৌজা দর ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৯২ টাকা।

এ হিসেবে জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী তিনগুণ হিসাবে ২০০ শতাংশ জমির ক্ষতিপূরণ মূল্য ২৮ কোটি ৫২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা হওয়ার কথা।

গাছপালা ও অবকাঠামোর মূল্য ১ লাখ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু শুধু জমির দামই প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৬ কোটি ২ লাখ ৮৩ হাজার ২০০ টাকা।

আর ১ লাখ টাকার গাছপালা ও অবকাঠামোর দাম দেখানো হয় ৬ কোটি টাকা। এই ২ একর জমিতেই সরকারের ক্ষতি ৭ কোটি ৫১ লাখ ৮ হাজার টাকা।

সাভার থানার হেমায়েতপুর এলাকার বিলামালিয়া মৌজার ২ একর জমি ভূমি অফিসের পর্চা অনুযায়ী কিছু অংশ পুকুর শ্রেণির। এছাড়া অধিকাংশ জমির শ্রেণি নাল। এখানে প্রতি শতাংশের মৌজা দর ৪ লাখ ১১ হাজার ১২ টাকা।

সে হিসেবে জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী তিনগুণ করে দুইশ’ শতাংশ জমির ক্ষতিপূরণ মূল্য আসে ২৪ কোটি ৬৭ লাখ ৭ হাজার টাকা।

আর গাছপালা ও অবকাঠামোর মূল্য ১ লাখ টাকাই যথেষ্ট। অথচ পিডি আমিরুলের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট ২০০ শতাংশ জমির প্রস্তাবিত মূল্য নির্ধারণ করেছে ৮১ কোটি ৮২ লাখ ৭৮ হাজার ৬৮ টাকা।

যার মধ্যে ২১টি নারকেল গাছের দাম ১ লাখ টাকা হওয়ার কথা। সেখানে অবকাঠামো দেখিয়ে ১৩ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়। এই ২ একর জমিতেই সরকারের ক্ষতি হবে ৫৭ কোটি ১৬ লাখ ৭১ হাজার ৬৮ টাকা।

এছাড়া সাভার থানার নবীনগর এলাকার পাথালিয়া-বাঁশবাড়িয়া মৌজার ২ একর জমি পর্চা অনুযায়ী কিছু অংশ নাল শ্রেণির। অধিকাংশ জমির শ্রেণি ডোবা।

প্রতি শতাংশ জমির মৌজা দর ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। সে হিসেবে জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী তিনগুণ হিসাবে ২০০ শতাংশ জমির ক্ষতিপূরণ মূল্য ২৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা হওয়ার কথা।

সেখানে জমির প্রস্তাবিত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬ কোটি ৩৪ লাখ ১৯ হাজার ৬৭৬ টাকা। যার মধ্যে দেড় লাখ টাকার অবকাঠামো স্থাপনার ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেখানো হয় ৬ কোটি টাকা।

এই ২ একর জমিতেই সরকাররে ক্ষতি ৭ কোটি ৮৪ লাখ ১৯ হাজার ৬৭৬ টাকা। এই জমিতে কোনো গাছপালা নেই। ৩টি টিনশেড ১০ ফিট বাই ১৫ ফিট অবকাঠামোর জন্য পিডি দাম প্রস্তাব করেছেন প্রতিটি ৬ কোটি টাকা।

ঢাকা জেলার আশুলিয়া থানার বাইপাইল মৌজার ২ একর জমি ভূমি তফসিলে পর্চা অনুযায়ী কিছু অংশ নাল শ্রেণির। এছাড়া অধিকাংশ জমির শ্রেণি ডোবা। এখানে প্রতি শতাংশ জমির মৌজা দর ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।

আরও পড়ুন: ওসি প্রদীপসহ ৮ জনের ব্যাংক হিসাব স্থগিত

সে হিসেবে জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী তিনগুণ করে ২০০ শতাংশ জমির ক্ষতিপূরণ মূল্য ৩২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। আর গাছপালা ও অবকাঠামোর মূল্য ১ কোটি টাকা হবে।

সেখানে জমির প্রস্তাবিত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ কোটি ৩৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা। আর ১ কোটি টাকার অবকাঠামোর স্থলে দেখানো হয়েছে ১০ কোটি টাকা। এই ২ একর জমিতেই সরকারের ক্ষতি ২৭ কোটি ৭৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

ধামরাই থানার লাকুড়িয়াপাড়া মৌজার ২ একর জমি ভূমি অফিসের পর্চা অনুযায়ী কিছু অংশ নাল শ্রেণির অধিকাংশ জমির শ্রেণি পুকুর। এখানে প্রতি শতাংশের মৌজা দর ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

সে হিসেবে জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী তিনগুণ করে ২০০ শতাংশ জমির ক্ষতিপূরণ মূল্য ১৬ কোটি টাকা। আর গাছপালা ও অবকাঠামোর মূল্য ৩০ লাখ টাকা হওয়ার কথা।

সেখানে প্রস্তাবিত জমির মূল্য নির্ধারণ করেছেন ২৪ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার ৮০০ টাকা। আর ৩০ লাখ টাকা অবকাঠামোর দাম দেখানো হয় ৪ কোটি টাকা।

এই ২ একর জমিতেই সরকাররে ক্ষতি ৮ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার ৪০০ টাকা। এই জমিতে কোনো গাছপালা নেই। ১৬টি টিনশেড ঘরের দাম দেখানো হয়েছে প্রতিটি ৪ কোটি টাকা।

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার খোদ্দঘোষপাড়া মৌজা সাইনবোর্ড এলাকায়। খোদ্দঘোষপাড়া মৌজার প্রতি শতাংশ নাল শ্রেণির জমির মৌজা দর ৪ লাখ ২ হাজার ৫৭০ টাকা।

এই নাল শ্রেণির জমিকে বাণিজ্যিক শ্রেণি দেখানো হয়েছে। জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী এই দুই একর জমির ক্ষতিপূরণসহ দাম আসে ২৪ কোটি ১৫ লাখ ৪২ হাজার টাকা।

সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় এই দুই একর জমির বাণিজ্যিক জমি ও ভিটে মাটি দেখিয়ে ৯৮ কোটি ৪৪ লাখ ৬২ হাজার ১৬৩ টাকা প্রস্তাব করা হয়। এই ২ একর জমিতেই সরকাররে ক্ষতি ৭৪ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার ১৬৩ টাকা।

এই জমি সারা বছর কোমরপানিতে নিমজ্জিত থাকে। সেখানে গাছপালা বা অবকাঠামো নেই। কিন্তু এভাবে গাছপালা দেখিয়ে অস্বাভাবিক দাম নির্ধারণ করায় এখানে সরকারের ক্ষতি হয়েছে ৭৪ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার ১৬৩ টাকা।

উল্লেখ্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের (মাউশি) আওতায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর কর্তৃক ‘ঢাকা শহর সন্নিকটবর্তী’ এলাকায় ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেয়।

সেগুলো হচ্ছে- খিলক্ষেতের জোয়ারসাহারা, সাভারের নবীনগর, হেমায়েতপুর ও আশুলিয়ার বাইপাইল, সাঁতারকুল, ধামরাই, পূর্বাচল, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড ও চিটাগাং রোড।

প্রতিটি স্কুলের জন্য দুই একর পরিমাণ জমি নির্ধারণ করে মোট ৬৭৩ কোটি ৪৬ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ব্যয় ধরে ২০১৭ সালের ১৭ অক্টোবর প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় চলতি বছরের জুন পর্যন্ত।

প্রকল্প পরিচালক হিসেবে ড. আমিরুল ইসলাম ২০১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর যোগদান করেন। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাউশি বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের (উন্নয়ন) নেতৃত্বে জমি চিহ্নিতকরণ সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়।

ওই কমিটি একাধিকবার জমি সরেজমিন পরিদর্শন করে ১০টি বিদ্যালয়ের জন্য ২ একর করে মোট ২০ একর জমি চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করে।

সূত্র : যুগান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *